শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যুবলীগের বিক্ষোভ, শেখ হাসিনাসহ নেতাদের বিরুদ্ধে রায় প্রত্যাহারের দাবি। সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত দৈনিক হৃদয় বার্তার পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত সাতক্ষীরায় একাধিক মামলার আসামি আসাদুলের জামিন আবেদন নামঞ্জুর ঝিনাইদহ কালীগঞ্জে বিএনপি নেতা ইসরাইল হোসেন জীবনের ইন্তেকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ রিপোর্টার্স সোসাইটির নবনির্বাচিত কমিটির শপথ গ্রহণ চেয়ারম্যান শেখ মো. ফরিদ আহমেদ চিশতী, মহাসচিব কে.এম. মোহাম্মদ হোসেন রিজভী নির্বাচিত ফলোআপ: কেশবপুরে দম্পতি হত্যার রহস্য উদঘাটন : পরকীয়া প্রেমিক-প্রেমিকা গ্রেপ্তার গলাচিপায় ৫০০ গ্রাম গাঁজাসহ জেসমিন নামের এক নারী আটক বিমানের আর্থিক অনিয়ম ও যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়ে সংসদীয় কমিটির কঠোর অবস্থান, চীফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠক ঢাকা, ২ নভেম্বর ২০২৬: বাংলাদেশ রিপোর্টার্স সোসাইটির নবনির্বাচিত কমিটির পরিচিতি সভা ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মরহুম আঃ আজিজ মাহফুজের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব বাতিল চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ইঞ্জিনিয়ার শ্যামলের লিখিত আবেদন।

জ্বালানি সংকটের বার্তা: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?

রাজধানীর পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জ্বালানি না পাওয়া, কোথাও কোথাও পাম্প বন্ধ- এই দৃশ্য হঠাৎ করেই জনজীবনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও সরকার বলছে দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, তবু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন এক সংকেত দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে- এটি কি কেবল সাময়িক সরবরাহ সংকট, নাকি বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির প্রভাবের একটি আগাম সতর্কবার্তা?

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি মৌলিক বাস্তবতা হলো- এটি ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। দেশে ব্যবহৃত জ্বালানির একটি বড় অংশই বিদেশ থেকে আসে। শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও কৃষি- সব ক্ষেত্রেই ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব দ্রুত দেশের বাজারে পড়তে শুরু করে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ টনের বেশি ডিজেল মজুদ রয়েছে, যা প্রায় দুই সপ্তাহের চাহিদা পূরণ করতে পারে। পেট্রল ও অকটেনের মজুদও কয়েক সপ্তাহের জন্য যথেষ্ট বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়মিতভাবে জ্বালানিবাহী জাহাজও আসছে। তবু বাস্তবে পাম্পগুলোতে চাপ বাড়ছে- যার বড় কারণ আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সাময়িক বিঘ্ন।
এই পরিস্থিতির পেছনে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ ব্যারেলের কাছাকাছি তেল ব্যবহার করে। এই চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
এদিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির বাজারেও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে বাংলাদেশকে আগের তুলনায় অনেক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে, যা সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রথমত, দেশে এখনও পর্যাপ্ত কৌশলগত জ্বালানি মজুদ নেই। উন্নত অনেক দেশ কয়েক মাসের জ্বালানি মজুদ ধরে রাখে, যাতে বৈশ্বিক সংকটের সময়ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়। বাংলাদেশে সাধারণত কয়েক সপ্তাহের বেশি মজুদ থাকে না।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ এখনও সীমিত। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর। গ্যাসের স্থানীয় মজুদ কমে যাওয়ায় তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি- বিশেষ করে সৌরশক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবায়নের গতি এখনও ধীর।
তৃতীয়ত, সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। কোথায় কত চাহিদা এবং কোথায় কত সরবরাহ- এই তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
তবে আশার দিকও রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অন্যান্য উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে।
তবে এই ধরনের উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে- জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ, কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী জ্বালানি কূটনীতি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। আতঙ্কে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা বা মজুদ করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সংকটের সময়ে নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি কেবল অর্থনীতির একটি উপাদান নয়; এটি একটি দেশের উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ভিত্তি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই একটি বড় সতর্কবার্তা- বাংলাদেশকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার দিকে আরও পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। অন্যথায় বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রতিটি ঢেউ ভবিষ্যতেও দেশের অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলতে পারে।

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.


ফেসবুকে আমরা