খন্দকার জলিল, জেলা প্রতিনিধি, পটুয়াখালী
বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। আর এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো গ্রামীণ বৈশাখী মেলা। তবে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার মানুষের জন্য এবারের নববর্ষের বার্তা নিয়ে এসেছে কিছুটা বিষাদ। দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্য ভেঙ্গে এবার গলাচিপায় আয়োজন করা হচ্ছে না কোনো বৈশাখী মেলা। ফলে মেলাকেন্দ্রিক উৎসবের আমেজ থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে এই অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ।
বাংলার অন্যতম পুরনো ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য হলো এই গ্রামীণ মেলা। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে মেলা মানেই ছিল বছরের শ্রেষ্ঠ সময়। সারা বছর অপেক্ষায় থাকা সেই ক্ষণ—বাবার হাত ধরে মেলায় যাওয়া, বাঘ-সিংহের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ানো, ভেঁপু বাজিয়ে চারপাশ মুখরিত করা, আর ঘোড়া কিংবা নাগরদোলার সেই রোমাঞ্চ; সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
মেলার সেই পরিচিত দৃশ্যগুলো—যেমন মাটির খেলনা, তালপাতার বাঁশি, বিভিন্ন নকশা করা পিঠা-পুলি এবং বাহারি লোকজ খাবার—এসবই আজ ঐতিহ্যের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। কেবল শিশুরাই নয়, বড়দের জন্যও এই মেলা ছিল মিলনমেলার এক বড় ক্ষেত্র। সন্ধ্যার পর আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাত্রাপালা ও লোকজ গান যেন গ্রামীণ জনপদে প্রাণের সঞ্চার করত।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের অবস্থান জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, মেলা আয়োজনের বিষয়ে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা তাদের হাতে আসেনি। নির্দেশনা না থাকায় আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞ মহল ও স্থানীয় সুশীল সমাজের মতে, মেলার এই অনুপস্থিতি কেবল আনন্দ উদযাপন থেকে বঞ্চিত হওয়া নয়, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রেক্ষাপট। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী:
• বৈশ্বিক পরিস্থিতি: আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে জনজীবনে।
• জ্বালানি ও ব্যয় সংকোচন: দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সরকারি নীতির কারণে হয়তো জনসমাগমপূর্ণ বড় আয়োজনগুলো সীমিত রাখা হচ্ছে।
মেলা কেবল কেনাকাটার স্থান নয়, এটি আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যদি বড় পরিসরে সম্ভব না হয়, তবে সীমিত পরিসরে হলেও যেন এই গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারা বজায় রাখা হয়। কারণ, মেলা বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের লোকজ কারুশিল্পীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি নতুন প্রজন্ম তাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
গলাচিপার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আগামীতে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আবারও মেলায় মেলায় মুখরিত হবে পটুয়াখালীর প্রতিটি প্রান্তর, বাজবে শিশুদের সেই আনন্দের ভেঁপু।