শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যুবলীগের বিক্ষোভ, শেখ হাসিনাসহ নেতাদের বিরুদ্ধে রায় প্রত্যাহারের দাবি। সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত দৈনিক হৃদয় বার্তার পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত সাতক্ষীরায় একাধিক মামলার আসামি আসাদুলের জামিন আবেদন নামঞ্জুর ঝিনাইদহ কালীগঞ্জে বিএনপি নেতা ইসরাইল হোসেন জীবনের ইন্তেকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ রিপোর্টার্স সোসাইটির নবনির্বাচিত কমিটির শপথ গ্রহণ চেয়ারম্যান শেখ মো. ফরিদ আহমেদ চিশতী, মহাসচিব কে.এম. মোহাম্মদ হোসেন রিজভী নির্বাচিত ফলোআপ: কেশবপুরে দম্পতি হত্যার রহস্য উদঘাটন : পরকীয়া প্রেমিক-প্রেমিকা গ্রেপ্তার গলাচিপায় ৫০০ গ্রাম গাঁজাসহ জেসমিন নামের এক নারী আটক বিমানের আর্থিক অনিয়ম ও যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়ে সংসদীয় কমিটির কঠোর অবস্থান, চীফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠক ঢাকা, ২ নভেম্বর ২০২৬: বাংলাদেশ রিপোর্টার্স সোসাইটির নবনির্বাচিত কমিটির পরিচিতি সভা ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মরহুম আঃ আজিজ মাহফুজের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব বাতিল চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ইঞ্জিনিয়ার শ্যামলের লিখিত আবেদন।

আশ্রয় পেয়েও রেহাই নেই: সাতক্ষীরায় বাস্তুচ্যুতদের ঘিরে ময়লার ছায়া

মোঃ আজগার আলী, স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা:

১৯৮৮ সালের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের পর শ্যামনগরের নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে স্বামী মুনতাজ আলীকে নিয়ে সাতক্ষীরা শহরের কামালনগরে আশ্রয় নিয়েছিলেন রিজিয়া বেগম। চার দশক পেরিয়ে গেছে, বয়স হয়েছে ৬৫, কিন্তু দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। আগের প্রাকৃতিক দুর্যোগের বদলে এখন নতুন সংকট— ময়লা-আবর্জনায় ঘেরা বিষাক্ত পরিবেশ।

“ঘরের সামনের বাগানেই ময়লা ফেলা হয়। নিষেধ করলে শোনে না কেউ। জায়গার মালিকই বলে ফেলতে, কিন্তু আমার দরজার সামনে কেন?”—প্রশ্ন রিজিয়ার।

ঘরহীন মানুষের ভিড়ে হাঁসফাঁস শহর:
জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় আশাশুনি, শ্যামনগর, কালিগঞ্জসহ উপকূলীয় এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে সাতক্ষীরা শহরে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার পরিবার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা শহরের মোট জনসংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৯৭ জনের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার মানুষই বাস্তুচ্যুত।

এসব মানুষ শহরের কামালনগর, বোসপাড়া, লিচুতলা, রাজারবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠা বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। নেই ডাস্টবিন, নেই সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। রাস্তাঘাট, পুকুর কিংবা বাড়ির গেটের সামনেই ফেলা হচ্ছে আবর্জনা।

দক্ষিণ কামালনগরের বাসিন্দা জাহিদা বেগম বললেন, “জায়গা নাই, ডাস্টবিন নাই, কোথায় ফেলবো? সবাই ফেলে, আমিও ফেলি। জানি রোগ হবে, কিন্তু করবো কী?”

ময়লা জমে শহরের ফুসফুস বন্ধ:
সাতক্ষীরা পৌরসভার কনজারভেন্সি ইন্সপেক্টর মোঃ ইদ্রিস আলী বলেন, “শহরে প্রায় ৫০-৫৫টি ডাস্টবিন আছে। নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। তবে যানবাহন সংকট আমাদের বড় সমস্যা। মাত্র দুটি গাড়ি দিয়ে ৯টি ওয়ার্ডে কাজ চালানো কঠিন।”

পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকলেও ডাস্টবিনের সংকট, সরু গলি, যানজট ও বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যত ভেঙে পড়েছে।

শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসে বিষ:
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ কুদরত-ই-খুদা বলেন, “বর্জ্য থেকে নির্গত অ্যামোনিয়া, সালফারসহ বিষাক্ত গ্যাস শিশুদের ফুসফুসে ঢুকছে। এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, লিভার ও ফুসফুসজনিত সমস্যা বেড়েছে।”

শহরে জলবায়ু সংকটের নতুন রূপ: ‘নগর দুর্যোগ’:
পরিবেশবিদ ও উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, সাতক্ষীরা এখন একটি নগর দুর্যোগের মুখে। উপকূল থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে এসে বসতি গড়া মানুষদের তৈরি বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ না হওয়ায় শহরের পরিবেশ ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে।

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব-এর সভাপতি এড. মুনির উদ্দীন বলেন, “সাতক্ষীরা শহরের চারপাশে এখন প্রায় ৪৭টি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বস্তি রয়েছে। সেখানে না আছে পরিকল্পিত বসতি, না আছে স্যানিটেশন বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ফলে শুধু আশ্রয় পাওয়া নয়, প্রতিনিয়তই নতুন দুর্যোগে পড়ছে মানুষ।”

প্রশাসনের স্বীকারোক্তি: সীমাবদ্ধতা আছে-
সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রশাসক মাশরুবা ফেরদাউস জানান, “বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের বড় সীমাবদ্ধতা হলো বাজেট ও জায়গার সংকট। নতুন ল্যান্ডফিল বা ডাস্টবিন বসানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় বাধা আসে। পুরনো অবকাঠামো ও দ্রুত নগরায়নের চাপে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না।”

সমাধান কী?
পরিবেশবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধানের জন্য জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে:
১. শহরের বাইরে আধুনিক ল্যান্ডফিল স্থাপন।
২. প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিউনিটি ডাস্টবিন।
৩. পৌরসভার জনবল ও বাজেট বৃদ্ধি।
৪. বাড়ি ও স্কুলভিত্তিক বর্জ্য সচেতনতা।
৫. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বিত কর্মসূচি।
৬. স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ।

সবার জন্যই এই দায়:
এখনকার বর্জ্য আর শুধু দুর্গন্ধ নয়—এটি জলবায়ু সংকটের অংশ। শহরের প্রতিটি বাসিন্দা, প্রশাসন ও সরকার—সবারই দায়িত্ব আছে এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসার। বাস্তুচ্যুত মানুষেরা আশ্রয় চেয়েছে, কিন্তু এখন তারা আশ্রয়েই বেঁচে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে।

পরিবেশ রক্ষা, নাগরিক স্বাস্থ্য রক্ষা ও টেকসই শহর গড়ার জন্য এখনই দরকার সমন্বিত ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.


ফেসবুকে আমরা