সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
​গলাচিপায় ৩০ পিস ইয়াবাসহ যুবক গ্রেফতার সাতক্ষীরায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল ​গলাচিপায় গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু: স্বামী ও বন্ধুসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা মাদক চক্রের গডফাদার ১৬ মামলার আসামি মনির ও তার সহযোগী গ্রেফতার, শ্রীপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের ঈদ পুনর্মিলনী ও সংবর্ধনা সভা অনুষ্ঠিত। বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন: সংকটের ভেতর সম্ভাবনার ভিত্তি নির্মাণ রাজশাহীতে সন্ত্রাসী জুলু আটক” ৫ সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার হুমকি ঝিনাইদহে ৮ বছরের শিশু ধ-র্ষ-ণ , জনতার হাতে আটক ধর্ষক, ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে- *জিয়ার স্মরণে অসহায় মানুষের হাতে উপহার তুলে দিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক* ভারতের মাটিতে হ্যাটট্রিক শিরোপার হাতছানি: মেয়েদের সাফ ফুটবল নিয়ে আশাবাদী যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন: সংকটের ভেতর সম্ভাবনার ভিত্তি নির্মাণ

তাসলিমা শারমিন,স্টাফ রিপোর্টার:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার পরিবর্তন সবসময়ই নতুন প্রত্যাশা, নতুন চাপ এবং নতুন পরীক্ষার সূচনা করে। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিনও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়। রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক চাপ এবং সামাজিক অস্থিরতার একটি জটিল প্রেক্ষাপটে যাত্রা শুরু করা এই সরকারের জন্য প্রথম ধাপটি ছিল স্বাভাবিকভাবেই চ্যালেঞ্জপূর্ণ।

তবুও এই একশ দিনে সরকার যেসব নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে, তা ভবিষ্যতের সম্ভাবনার একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছে- এমন মূল্যায়ন অস্বীকার করার সুযোগ কম।

যেকোনো নতুন সরকারের ক্ষেত্রে প্রথম ১০০ দিনকে সাধারণত দিকনির্দেশনা নির্ধারণের সময় হিসেবে দেখা হয়। এ সময়েই বোঝা যায় সরকারের অগ্রাধিকার, নীতি-দর্শন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি। সেই বিবেচনায় এই সময়কালকে কেবল ফলাফলের মানদণ্ডে বিচার করা যথাযথ নয়, বরং এটিকে ভবিষ্যৎ গঠনের সূচনাপর্ব হিসেবে দেখা অধিক যৌক্তিক।

সরকার দায়িত্ব নেয় এমন সময়ে, যখন দেশের অর্থনীতি একাধিক চাপের মধ্যে ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা অর্থনীতিকে জটিল অবস্থায় ফেলেছিল। এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং ভবিষ্যৎ সংস্কারের পথ তৈরি করাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ।

এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নেওয়া কিছু পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ মওকুফ গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আরও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর দাবি ছিল, যা এই উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে আংশিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

কৃষি খাতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের উদ্যোগও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি, ঋণ ও সেবা বিতরণকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে কৃষি খাতকে আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি ভিত্তি।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকার তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা এবং আর্থিক খাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়।

সরকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পরিকল্পনাভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এই ধরনের পরিকল্পিত কার্যক্রম সবসময় শক্তিশালী ছিল না, ফলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থানও নজর কাড়ে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জনমনে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিন আলোচিত কিছু অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্নীতি দমন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হলেও এর সূচনা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সহজ নয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নিতে সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে সরকার মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

বিচার ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার কিছু উদ্যোগও লক্ষণীয়। কয়েকটি আলোচিত মামলায় দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া জনআস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আইনের শাসন কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়- এই দিকেই কিছু অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের আচরণ তুলনামূলকভাবে সংযত। সংসদে বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক সংকেত। বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই সংযম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দিকেও কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়েছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।

স্বাস্থ্য খাতে হামের প্রাদুর্ভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবে দ্রুত বরাদ্দ প্রদান এবং দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার মাধ্যমে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে। সংকটকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন সক্ষমতা একটি সরকারের কার্যকারিতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সরকার সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় অর্থনীতি, কূটনীতি ও বিনিয়োগ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

তবে এ কথাও সত্য যে সব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। মূল্যস্ফীতি এখনো চাপ তৈরি করছে, বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি এবং কর্মসংস্থানও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও জনমনে উদ্বেগ রয়ে গেছে। তবে এগুলোকে তাৎক্ষণিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটি পূর্ববর্তী কাঠামোগত দুর্বলতার ধারাবাহিকতা।

প্রথম ১০০ দিনে


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.


ফেসবুকে আমরা