জ্বালানি সংকটের মুখে সরকারগুলোর প্রথম প্রতিক্রিয়া সাধারণত হয় দ্রুত, দৃশ্যমান এবং তুলনামূলকভাবে সহজে বাস্তবায়নযোগ্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে অফিস সময় এক ঘণ্টা কমানো, ব্যাংকিং লেনদেন সীমিত করা, সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ রাখা, সামাজিক অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা নিরুৎসাহিত করা এবং সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ-ঘিরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং তেলের দামের ওঠানামা এই সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু নীতিনির্ধারণের প্রশ্নে একটি মৌলিক বিষয় সামনে আসে- এই পদক্ষেপগুলো কি কেবল তাৎক্ষণিক চাপ সামাল দেওয়ার জন্য, নাকি এগুলো বাস্তবিক অর্থেই জ্বালানি সাশ্রয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে? প্রথমেই সরকারি অফিস সময় কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যাক। বাংলাদেশে সরকারি অফিসগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রধান খাতগুলো হলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, আলো এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সরঞ্জাম। একটি গড় অফিসে কর্মঘণ্টার শেষ ভাগে কার্যক্রমের তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কমে আসে- এটি একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। ফলে এক ঘণ্টা কমানো হলে তাত্ত্বিকভাবে ১০-১২ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হলেও বাস্তবে তা ৫-৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কর্মঘণ্টা কমানো হলেও কাজের চাপ অপরিবর্তিত থাকে, ফলে কর্মীরা বিকল্প সময়ে বা অতিরিক্ত সময় থেকে কাজ শেষ করেন। এতে করে মোট শক্তি ব্যবহারে প্রত্যাশিত সাশ্রয় নাও আসতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “লোড প্রোফাইল” বা বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময়ভিত্তিক বণ্টন। যদি অফিস সময় কমানোর ফলে পিক আওয়ারে (চাহিদার সর্বোচ্চ সময়) চাপ কমানো যায়, তাহলে তা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, যা কেবল সময়সূচি পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্জন করা কঠিন। ব্যাংকিং খাতে সময়সীমা কমানোর সিদ্ধান্তও একই ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি বড় অংশই ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল- ডাটা সেন্টার, সার্ভার, এটিএম নেটওয়ার্ক এবং অনলাইন লেনদেন প্ল্যাটফর্ম ২৪ ঘণ্টাই সচল থাকে। ফলে শাখা খোলা থাকার সময় এক ঘণ্টা কমানো মানেই বিদ্যুৎ ব্যবহারে সমানুপাতিক হ্রাস- এমনটি নয়। বরং গ্রাহকের ভিড় কম সময়ে বেশি ঘনত্বে তৈরি হলে শাখা পর্যায়ে কার্যক্রমের চাপ বাড়তে পারে। দোকান ও শপিংমল সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত তুলনামূলকভাবে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। নগর অর্থনীতিতে বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি বড় অংশই সন্ধ্যার পর ঘটে। বিশেষ করে আলোকসজ্জা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে এই সময়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৩০-৪০ শতাংশই সন্ধ্যা ও রাতের সময়ে হয়। সে হিসেবে সময়সীমা কমিয়ে আনা হলে ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব হতে পারে- যদি বাস্তবায়ন কঠোরভাবে নিশ্চিত করা যায়। তবে এর অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। বাংলাদেশের খুচরা বাণিজ্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করে সন্ধ্যা ও রাতের ক্রেতাদের ওপর- বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষেরা অফিস শেষে কেনাকাটা করেন। ফলে সময়সীমা কমানো মানে বিক্রয় হ্রাস, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে জ্বালানি সাশ্রয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি স্পষ্ট দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্তকে তুলনামূলকভাবে কাঠামোগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। নতুন যানবাহন ক্রয় স্থগিত করা, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমানো এবং প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচন- এসব উদ্যোগ জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এই ধরনের সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা পুরোপুরি নির্ভর করে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ওপর। অতীতে অনেক সময়ই দেখা গেছে, ঘোষিত সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপ বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। সামাজিক অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা সীমিত করার সিদ্ধান্ত তুলনামূলকভাবে প্রতীকী হলেও এর একটি মনস্তাত্ত্বিক দিক রয়েছে। এটি নাগরিকদের মধ্যে সাশ্রয়ী আচরণ গড়ে তোলার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে জাতীয় পর্যায়ে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের তুলনায় এই খাতের অবদান অত্যন্ত সীমিত- সম্ভবত ১ শতাংশেরও কম। ফলে এর সরাসরি প্রভাব খুব বেশি নয়। এই পদক্ষেপগুলোর সামগ্রিক প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গেলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে- বাংলাদেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের কাঠামো কী বলছে? দেশে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশই শিল্প খাতে, এরপর আবাসিক এবং তারপর বাণিজ্যিক খাত। সরকারি অফিস এবং সামাজিক অনুষ্ঠানের সম্মিলিত অংশ তুলনামূলকভাবে ছোট। ফলে এই খাতগুলোতে সাশ্রয় করলেও সামগ্রিক চাহিদায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা কঠিন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিস্টেম লস বা প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক ক্ষতি। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শক্তি অপচয় হয়। এই অপচয় কমানো গেলে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব, তা অনেক ক্ষেত্রেই অফিস সময় কমানোর মতো পদক্ষেপের চেয়ে বেশি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক কৌশল। এর মধ্যে রয়েছে- নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শক্তি দক্ষ প্রযুক্তির প্রসার, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সুশাসন নিশ্চিত করা। অনেক দেশ ইতিমধ্যে “ডিমান্ড-সাইড ম্যানেজমেন্ট” বা চাহিদা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়িয়েছে- যেখানে কেবল সময়সূচি নয়, প্রযুক্তি ও আচরণগত পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, ভবন নির্মাণে এনার্জি কোড কঠোরভাবে প্রয়োগ করা, এবং শিল্প খাতে দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া- এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। সবশেষে বলা যায়, বর্তমান পদক্ষেপগুলোকে সম্পূর্ণ অকার্যকর বলা যাবে না। এগুলো কিছুটা সাশ্রয় আনতে পারে, বিশেষ করে যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। তবে এগুলো মূলত স্বল্পমেয়াদি এবং আংশিক সমাধান। জ্বালানি খাতের গভীরতর সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া এই ধরনের উদ্যোগ টেকসই ফল বয়ে আনবে না। সংকটের সময়ে “আলো নিভিয়ে” সাশ্রয় করার চেষ্টা অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রয়োজন আলো জ্বালানোর মতো দূরদর্শী নীতি- যা কেবল বর্তমান সংকটই নয়, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথও তৈরি করবে। ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ লেখক সাংবাদিক কলামিস্ট ও বিশ্লেষক