শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ০৯:৩৮ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
শুক্রবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব–এর সামনে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে ১–৭ মে অনুষ্ঠিতব্য ১০ম জাতীয় গণমাধ্যম সপ্তাহ ২০২৬–এর কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। শ্রমিক-মালিক ঐক্যেই সমৃদ্ধির পথ—মহান মে দিবস ২০২৬ উপলক্ষে শ্রদ্ধা ও সংহতির আহ্বান টঙ্গীতে অভিযানে ধরাছোঁয়ার বাইরে অভিযোগভুক্ত নারী মাদক ব্যবসায়ী আটক, উদ্বেগে এলাকাবাসী শৈলকুপায় আলোচিত ঘটনা: মেয়ের জন্য ঠিক করা পাত্রের সঙ্গে পালিয়েছেন মা গোমস্তাপুরে ইনসাব এর আয়োজনে ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত। মহান মে দিবসে শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে মাতৃজগত পত্রিকা ও বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব লালমোহনে সড়ক সম্প্রসারণে অনিয়মের অভিযোগ, নিম্নমানের কাজে ক্ষোভ পটুয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতি নির্বাচন: জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নিরঙ্কুশ জয় ঘুষ দুর্নীতি দূরে থেকে সাধারণ মানুষের সেবা করার আহ্বান- আটঘরিয়ায় নবাগত জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম  কালীগঞ্জে রিক্সা ও ভ্যান চালকদের মাঝে ছাতা বিতরণ

কৃত্রিম সংকটের অর্থনীতি: তেল নিয়ে কারা খেলছে?

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অভিঘাত নতুন নয়; কিন্তু প্রতিবারই তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- বিশ্বায়নের যুগে কোনো সংকটই আর ‘দূরের’ থাকে না। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সংঘাতও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িত নয়, তবু জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা আমাদের অর্থনীতির ভেতরের কিছু গভীর দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে- এই সংকট কি বাস্তব, নাকি কৃত্রিম? আর যদি কৃত্রিম হয়, তাহলে তেল নিয়ে কারা খেলছে?

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেল ফুরিয়ে যাওয়া, এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার লিটার তেল অবৈধভাবে মজুত অবস্থায় উদ্ধার- এসব ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাজারে কোনো না কোনো অস্বাভাবিকতা কাজ করছে। এই বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে আমাদের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার দিকে তাকাতে হয়- ‘কৃত্রিম সংকট’।
কৃত্রিম সংকট বলতে বোঝায় এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে প্রকৃতপক্ষে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও বিভিন্ন আচরণগত ও প্রণোদনাগত কারণে বাজারে ঘাটতির অনুভূতি তৈরি হয়। বাংলাদেশে বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি অনেকাংশেই সেই কাঠামোর সঙ্গে মিলে যায়। এখানে সরবরাহের ঘাটতির চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে মানুষের আচরণ, প্রত্যাশা এবং বাজারের কিছু অংশগ্রহণকারীর কৌশলগত পদক্ষেপ।
প্রথমেই আসে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয়ের প্রসঙ্গ। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়তে পারে- এই আশঙ্কা মানুষের মনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে সংরক্ষণ করতে শুরু করেন। এতে করে স্বল্প সময়ের মধ্যে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং বাজারে সরবরাহ অপ্রতুল মনে হয়। বাস্তবে হয়তো সরবরাহে কোনো বড় ঘাটতি নেই, কিন্তু অতিরিক্ত চাহিদা একটি ‘সংকটের ভ্রম’ তৈরি করে।
এই আচরণকে অর্থনীতিতে বলা হয় ‘self-fulfilling prophecy’- অর্থাৎ সংকটের ভয়ে যে আচরণ, সেটিই শেষ পর্যন্ত সংকটকে বাস্তবে রূপ দেয়। বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের বাজার এই চক্রে আটকে পড়েছে। মানুষ তেল পাচ্ছে না বলে আরও বেশি তেল কিনতে চাইছে, আর সেই বাড়তি চাহিদাই তেলের অপ্রতুলতা তৈরি করছে।
তবে এই পুরো চিত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ‘অপরচুনিস্টিক’ বা সুযোগসন্ধানী আচরণ। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভবিষ্যতে বেশি দামে বিক্রির আশায় বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করে রাখছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় আবাসিক ভবন, গোপন ট্যাংক, এমনকি গোয়ালঘর থেকেও হাজার হাজার লিটার তেল উদ্ধার হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে- এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি সংগঠিত প্রবণতা।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে- এই ‘খেলা’ কারা খেলছে? এর উত্তর একমাত্রিক নয়। এখানে কয়েকটি স্তর রয়েছে।
প্রথমত, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলার, যারা বাজারের অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করতে চায়। দ্বিতীয়ত, কিছু ভোক্তা, যারা আতঙ্কে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনে বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে। তৃতীয়ত, একটি দুর্বল বাজার তদারকি ব্যবস্থা, যা সময়মতো এই অস্বাভাবিক আচরণগুলো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। সরকার ইতোমধ্যে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, বিজিবি মোতায়েন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এগুলো মূলত প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা- অর্থাৎ সংকট তৈরি হওয়ার পর তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতি কি আগে থেকে অনুমান করা যেত না? বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার লক্ষণ তো আগেই স্পষ্ট ছিল। সেই অনুযায়ী আগাম প্রস্তুতি, বাজার তদারকি এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে হয়তো এই সংকট এতটা তীব্র হতো না।
তথ্যের স্বচ্ছতার বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি বলে সরবরাহ স্বাভাবিক, কিন্তু ভোক্তা যদি পাম্পে গিয়ে তেল না পায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আস্থার সংকট তৈরি হয়। এই আস্থাহীনতা আবার নতুন করে ‘প্যানিক বায়িং’কে উসকে দেয়। ফলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়, যা ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে।
আইনের বিষয়টিও এখানে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে মজুতদারি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে- মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিতে শাস্তির কঠোরতার চেয়ে তার প্রয়োগের নিশ্চয়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি অপরাধীরা মনে করে যে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম, তাহলে কঠোর আইনও তাদের নিরুৎসাহিত করতে পারে না।
এই সংকট আমাদের জ্বালানি নির্ভরতার দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভর করে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়ে। এই বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।
বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়ন, সরবরাহ উৎসের বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার- এসব বিষয়ে এখনই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজার তদারকিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা গেলে মজুতদারি ও কালোবাজারি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সবশেষে, এই সংকটকে কেবল জ্বালানি সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি ‘বিশ্বাসের সংকট’। যখন মানুষ সরকারের কথায় আস্থা পায় না, যখন বাজারে স্বচ্ছতা থাকে না, এবং যখন আইনের প্রয়োগ অনিশ্চিত থাকে- তখনই এমন কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।
অতএব, সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। শুধু অভিযান চালিয়ে বা জরিমানা করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন আস্থা পুনর্গঠন, তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতিতে সংস্কার আনা।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আতঙ্কে অপ্রয়োজনীয় মজুত না করে পরিস্থিতি বুঝে সচেতন আচরণ করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে শুধু সরকারের ওপর নয়, বরং সব অংশগ্রহণকারীর সম্মিলিত আচরণের ওপর।
জ্বালানি তেলের এই সংকট আমাদের


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.


ফেসবুকে আমরা