শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ০৫:৫৬ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
শৈলকুপায় আলোচিত ঘটনা: মেয়ের জন্য ঠিক করা পাত্রের সঙ্গে পালিয়েছেন মা গোমস্তাপুরে ইনসাব এর আয়োজনে ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত। মহান মে দিবসে শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে মাতৃজগত পত্রিকা ও বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব লালমোহনে সড়ক সম্প্রসারণে অনিয়মের অভিযোগ, নিম্নমানের কাজে ক্ষোভ পটুয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতি নির্বাচন: জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নিরঙ্কুশ জয় ঘুষ দুর্নীতি দূরে থেকে সাধারণ মানুষের সেবা করার আহ্বান- আটঘরিয়ায় নবাগত জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম  কালীগঞ্জে রিক্সা ও ভ্যান চালকদের মাঝে ছাতা বিতরণ সাতক্ষীরায় জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন কাউসার আজিজ চুয়াডাঙ্গায় ইউনিয়ন পরিষদে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা সাতক্ষীরা-যশোর সড়ক দূর্ঘটনায় যুবকের মৃত্যু

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সক্রিয়তা: কী ইঙ্গিত দিচ্ছে আওয়ামী লীগ?

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি- যেখানে আইন, ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, তা এখনো বহাল। তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, এই নিষেধাজ্ঞা দলটির রাজনৈতিক উপস্থিতিকে পুরোপুরি স্তব্ধ করতে পারেনি; বরং সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তাদের তৎপরতা নতুন মাত্রায় আলোচনায় উঠে আসছে।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি, মিছিল ও মানববন্ধনের দৃশ্য একদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, অন্যদিকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী অবস্থানকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে রাতের আঁধারে নেতাকর্মীদের শপথ পাঠের ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের কর্মীরা যখন প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্যভাবে নিজেদের সংগঠিত করে, তখন তা আর নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না- বরং তা হয়ে ওঠে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকেত।

প্রথমত, এই তৎপরতা স্পষ্ট করে যে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর ক্ষেত্রে এটি অস্বাভাবিক নয়। প্রশাসনিক বা আইনি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কার্যক্রম বন্ধ করা গেলেও সামাজিক ও সাংগঠনিক প্রভাব রাতারাতি বিলীন হয় না। স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা সম্পর্ক, আনুগত্য ও রাজনৈতিক পরিচয়ের যে জাল, তা অনেক সময় আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার বাইরেও টিকে থাকে।

দ্বিতীয়ত, এই সক্রিয়তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- কোণঠাসা বা নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রায়ই পুনর্গঠনের পথ খুঁজে নেয়। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো নীরবে তারা তাদের সমর্থকভিত্তি ধরে রাখতে চায় এবং অনুকূল সময়ের অপেক্ষায় থাকে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রস্তুতির অংশ বলেই প্রতীয়মান হয়।

তৃতীয়ত, এই পরিস্থিতি সরকারের জন্য এক সূক্ষ্ম ও জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আইনগতভাবে নিষিদ্ধ একটি দলের কার্যক্রম দমন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও, বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বৃহৎ দলের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করা কতটা কার্যকর- সেই প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক। অতিরিক্ত কঠোরতা রাজনৈতিক দমন হিসেবে ব্যাখ্যা হতে পারে, আবার শিথিলতা দলটিকে পুনর্গঠনের সুযোগ করে দিতে পারে। ফলে সরকারকে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্কও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। কক্সবাজারের একদল আইনজীবীর পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তাদের মতে, আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ না দিয়ে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হতে পারে। সংগঠন করার অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার- গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল ভিত্তি। ফলে এমন সিদ্ধান্ত সবসময়ই বড় রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়।

অন্যদিকে বাস্তবতা হলো- এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের পথ মোটেও মসৃণ নয়। আইনি নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ চাপ, নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা এবং জনসমর্থনের প্রশ্ন- সব মিলিয়ে দলটি এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারা তাদের অবস্থানকে আরও দুর্বল করেছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারি ও আইনগত ঝুঁকির কারণে তাদের কার্যক্রম পরিচালনাও সীমিত হয়ে পড়েছে।

তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ইঙ্গিত দেয়- দলটির একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকতে রাজি নয়। তারা বিভিন্নভাবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে সচেষ্ট- কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে কোন রূপ নেবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন; তবে এটুকু স্পষ্ট- আওয়ামী লীগ এখনো রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে মুছে যায়নি।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বহুমত ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, কিংবা রাষ্ট্র কতটা নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান নেবে- তা নির্ভর করে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের ওপর। বর্তমান পথ স্বল্পমেয়াদে কার্যকর মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কী হবে- সে প্রশ্ন রয়ে যায়।

একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকাও এখানে উপেক্ষণীয় নয়। রাজনৈতিক অধিকার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক মানদণ্ড- এই বিষয়গুলোতে তাদের অবস্থান ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, যা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হয়ে উঠতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও আওয়ামী লীগের সক্রিয়তা এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। এটি শুধু একটি দলের টিকে থাকার লড়াই নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য এক ধরনের পরীক্ষা। এই পরীক্ষাই নির্ধারণ করবে- রাজনীতি আরও উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পথে এগোবে, নাকি নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতার বলয়ে আবদ্ধ হবে।

ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয়- নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও, তাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যায় না। এখন দেখার বিষয়, সেই শক্তি কোন পথে ফিরে আসে, আর রাষ্ট্র সেই প্রত্যাবর্তনকে কীভাবে মোকাবিলা করে। বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী অধ্যায় অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপর।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.


ফেসবুকে আমরা