ইব্রাহিম খলিল, পাবনা জেলা প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের কৃষিতে এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। প্রচলিত ধান, পাট কিংবা গমের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বিদেশি ফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন তরুণ ও উদ্যমী কৃষকরা। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, নতুন জাতের ফল এবং লাভজনক উৎপাদনের সম্ভাবনা কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। সেই পরিবর্তনের ধারায় পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের গুরুবাসী গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম হিরো নিজের শখকে বাস্তবে রূপ দিয়ে গড়ে তুলেছেন বিদেশি জাতের খেজুরের একটি ব্যতিক্রমধর্মী বাগান। আজ তার এই উদ্যোগ শুধু একটি বাগানেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি এলাকার কৃষকদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে।
শখ থেকেই যাত্রার শুরু
২০২২ সালে গয়েশপুর এলাকার রাজিবের কাছ থেকে কয়েকটি উন্নত জাতের খেজুরের চারা সংগ্রহ করেন সাইফুল ইসলাম হিরো। প্রথমে ৩৩ শতাংশ জমিতে মাত্র চারটি চারা রোপণ করেন। অনেকেই তখন তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। অনেকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বিদেশি খেজুর হবে না। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। নিয়মিত পরিচর্যা, ধৈর্য, কৃষি বিষয়ক পড়াশোনা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকেন।
আজ সেই ছোট্ট উদ্যোগই পরিণত হয়েছে প্রায় ৬০টি গাছের সমৃদ্ধ একটি খেজুর বাগানে।
একই বাগানে সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় জাত
সাইফুল ইসলাম হিরোর বাগানে রয়েছে সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ১০ থেকে ১২টি উন্নত জাতের খেজুর। এর মধ্যে আজওয়া, মরিয়ম, মেজুল, ছুক্কারি, ওয়ারহিছ, বড়ইসহ বিভিন্ন জাতের গাছ রয়েছে। প্রতিটি জাতের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিছু গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার কিছু গাছে ইতোমধ্যেই প্রচুর পরিমাণে খেজুর ধরেছে। অনেক গাছ থেকে উন্নতমানের সাকার উৎপন্ন হয়েছে, যা দিয়ে নতুন বাগান গড়ে তোলা সম্ভব।
এখন গাছে ঝুলছে খেজুরের থোকা
বাগানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে গাছে ঝুলে থাকা খেজুরের থোকা। সবুজ পাতার ফাঁকে ফলভর্তি গাছ যেন এক টুকরো মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর বাগানের আবহ তৈরি করেছে। বর্তমানে অনেক গাছে প্রচুর পরিমাণে খেজুর ধরেছে। ফলে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষ বাগানটি দেখতে আসছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ চাষাবাদ সম্পর্কে জানছেন, আবার কেউ নতুন বাগান করার পরিকল্পনা নিয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন।
সাকার থেকেই নতুন সম্ভাবনা
বিদেশি খেজুর চাষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো উন্নতমানের সাকার। সাইফুল ইসলাম হিরোর বাগানের অনেক গাছেই এখন সাকার উৎপন্ন হচ্ছে। এসব সাকার থেকে নতুন গাছ তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে বিদেশি খেজুর চাষ আরও সহজ হবে। বর্তমানে মরিয়ম জাতের একটি চারার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, যা এই খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দেয়।
কৃষকের মুখেই সাফল্যের গল্প
কৃষক সাইফুল ইসলাম হিরো বলেন, “শুরুতে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস হারাইনি। নিয়মিত পরিচর্যা করেছি, বিভিন্ন উৎস থেকে খেজুর চাষ সম্পর্কে জেনেছি এবং সেই অনুযায়ী কাজ করেছি। এখন আমার বাগানের অনেক গাছে প্রচুর খেজুর ধরেছে। প্রতিদিনই মানুষ বাগান দেখতে আসে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বিদেশি খেজুর চাষ করতে চাই এবং নতুন উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “যারা নতুন করে বিদেশি খেজুর চাষ করতে চান, তাদের ধৈর্য ধরে সঠিক পরিচর্যা করতে হবে। তাহলে অবশ্যই সফল হওয়া সম্ভব।”
কৃষি বিভাগের আশাবাদ
একদন্ত ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিলি জানান, বিদেশি খেজুর চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, মাঠপর্যায়ে তদারকি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা করা হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে এই চাষ লাভজনক হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদা মোতমাইন্না বলেন, “আটঘরিয়ার মাটি ও জলবায়ু উন্নত জাতের বিদেশি খেজুর চাষের জন্য সম্ভাবনাময়। কৃষক সাইফুল ইসলাম হিরোর মতো উদ্যোক্তারা অন্য কৃষকদের অনুপ্রাণিত করছেন। কৃষি বিভাগ আধুনিক ও লাভজনক কৃষি সম্প্রসারণে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।”
এলাকাজুড়ে আগ্রহ
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও এলাকায় বিদেশি খেজুর চাষের কথা কেউ কল্পনাও করেননি। কিন্তু এখন প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে মানুষ এই বাগান দেখতে আসছেন। অনেকেই বাগান দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজ এলাকায় বিদেশি খেজুর চাষের পরিকল্পনা করছেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন কৃষক তার কাছ থেকে সাকার ও চারা সংগ্রহের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধির জন্য উচ্চমূল্যের ফল চাষের বিকল্প নেই। বিদেশি খেজুর চাষ সফলভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের ফল উৎপাদনে নতুন মাত্রা যোগ হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আটঘরিয়ার গুরুবাসী গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম হিরোর এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে—ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য, পরিশ্রম এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। তার সবুজ বাগানে দুলতে থাকা হলুল ও লালের বিদেশি খেজুরের থোকাগুলো আজ শুধু একটি সফল কৃষি উদ্যোগের প্রতীক নয়; বরং বাংলাদেশের কৃষির সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতেরও এক উজ্জ্বল বার্তা।