মোঃ শফিকুর রহমান,ঢাকা জেলা প্রতিনিধি:
বিআইডব্লিউটিএর একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফ হোসেন (পরিচালক) বিভিন্নভাবে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি রাজস্ব ক্ষতি এবং হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এ বিষয়ে একাধিকবার সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এসব অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
অভিযোগ রয়েছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে তিনি লন্ডনে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া বসুন্ধরা এলাকায় চারটি ফ্লোর ক্রয় করেছেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ৪০ (চল্লিশ) কোটি টাকা। এসব ফ্লোরের জন্য বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল ফার্নিচারও আমদানি করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় তার নামে ও বেনামে একাধিক বাড়ি ও প্লট রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মাদকসেবী ও নারীপিপাসু এই চিরকুমার কর্মকর্তা লাকি আক্তার সাথী। পিতা: আব্দুল লতিফ, মাতা: রেহেনা বেগম, গ্রাম: উত্তর টরকী, ডাকঘর: ইন্দুরিয়া-৩৬৪০, মতলব উত্তর, চাঁদপুর)-কে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন হোটেলে একাধিকবার মেলামেশা করেছেন। বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ভিডিও কলে অশালীন আচরণের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগ কারীদের দাবি, এ-সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেও সংরক্ষিত রয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলার মদের বার ও হোটেলে মদ্যপান এবং নর্তকীদের সঙ্গে নৃত্য করার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বর্তমানে বিএনপি নেতা কাসেমের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তিনি এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
আরিফের দুর্নীতির তথ্য
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর বন্দর ও পরিবহন শাখার পরিচালক এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন ওরফে আরিফ হাসান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৪-এ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে নিজেকে জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক-বাহক হিসেবে উপস্থাপন করছেন এবং অতীতের মতোই নিজের অনিয়ম ও দুর্নীতির সাম্রাজ্য বজায় রেখেছেন।
বিআইডব্লিউটিএর একটি সূত্রের দাবি, সাবেক চেয়ারম্যানের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) যেন টাকার খনি। অভিযোগ রয়েছে, এ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা অনেকেই অল্প সময়ে কোটিপতি বনে গেছেন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শুরু করে কেরানি, প্রধান প্রকৌশলী, পরিচালকসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে অনেকেই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্ত চলছে।
এদিকে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে শত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আমলে নিয়ে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
কে এই আরিফ উদ্দিন?
পুরো নাম: এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন
পিতা: করিম হাজী
গ্রাম: রামকৃষ্ণপুর
থানা: সুজানগর
জেলা: পাবনা
বর্তমানে তিনি বন্দর ও পরিবহন শাখার পরিচালক এবং ল্যান্ড অ্যান্ড এস্টেট বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, তিনি অত্যন্ত ক্ষমতাধর কর্মকর্তা এবং পাবনা জেলার সন্তান হওয়ায় নিজেকে আরও প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচনা করেন।
তার গ্রামের বাড়ি রামকৃষ্ণপুর, সুজানগর, পাবনায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তার প্রভাবশালী হয়ে ওঠার নানা তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র অনুযায়ী, তার স্ত্রী রুমানা এবং দুই সন্তান সাদ ও আমিন রয়েছে। তারা দুজনই বর্তমানে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে।
দুদকের অনুসন্ধান
স্মারক নং- ০০.০১.২৬০০.৬৩০.০১.২০৮.২৩-০৩১৭ অনুযায়ী দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক মোঃ হাফিজুল ইসলাম (অনুসন্ধান ও তদন্ত-২) ০৩/০৯/২০২৩ তারিখে পরিচালক (প্রশাসন), বিআইডব্লিউটিএ বরাবর একটি পত্র পাঠান।
ওই পত্রে “আরিফ হাসনাত” নামে এক যুগ্ম পরিচালকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধানের জন্য বিভিন্ন রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিআইডব্লিউটিএতে “আরিফ হাসনাত” নামে কোনো যুগ্ম পরিচালক কর্মরত ছিলেন না।
দুদকের চাহিদাপত্রে যেসব কাগজপত্র চাওয়া হয় তার মধ্যে রয়েছে— বিআইডব্লিউটিএ আওতাধীন নারায়ণগঞ্জ পোর্টের ০১/০১/২০১৯ থেকে ৩১/১২/২০২২ পর্যন্ত সময়ের হিসাব-সংক্রান্ত নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের বিবরণী এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্যাদি।
এ ছাড়া জনাব আরিফ হাসনাত, যুগ্ম পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএর ব্যক্তিগত নথি, চাকরিজীবনের শুরু থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত বেতন-ভাতার বিবরণী, দায়িত্ব-সংক্রান্ত অফিস আদেশ এবং তার স্ত্রী, সন্তান বা ভাইদের নামে পরিচালিত ব্যবসা বা শেয়ার সংক্রান্ত আবেদন ও অনুমোদনের তথ্যও চাওয়া হয়েছে।