খন্দকার জলিল, জেলা প্রধান, পটুয়াখালী: পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ও এর ক্ষতিকর প্রভাব দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর সঠিক বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র মাদকসেবীদের গ্রফতার না করে মূল মাদক কারবারি ও সিন্ডিকেটের হোতাদের আইনের আওতায় আনা গেলেই কেবল এ সামাজিক ব্যাধি থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলবে। মাদক চোরাচালান, বিক্রি, সেবন এবং এর সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট নির্মূলে বর্তমান সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সারা দেশে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে। সরকারের এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো মাদকের সরবরাহ বন্ধ করা এবং এর শিকড় উপড়ে ফেলা। তবে স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা গেছে, গলাচিপায় অধিকাংশ মাদকের চালান মূলত বিভিন্ন পন্থায় শহরে প্রবেশ করে থাকে। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ও রাজধানী থেকে নৌ কিংবা সড়ক পথে দূরপাল্লার বাসে কৌশলে এসব ইয়াবা, গাঁজার চালান গলাচিপায় আনা হয়। এরপর স্থানীয় পাইকারি কারবারিদের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের বড় প্রশ্ন—এসব মাদকের মূল চালান কীভাবে আসে এবং কারা এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন জানতে পারবে না? কেন দিনের পর দিন এসব গডফাদার ও রুট-মাস্টাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে? সচেতন মহলের মতে, মাঝেমধ্যে দুই-একজন সাধারণ মাদকসেবীকে আটকে দায় সারা হলেও অদৃশ্য কোনো কারনে মূল হোতারা রয়ে যাচ্ছে নিরাপদ দূরত্বে। ফলে সরবরাহ বন্ধ না হয়ে নতুন নতুন কৌশলে মাদকের রমরমা ব্যবসা চাঙ্গা থাকছে। এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা জোরালো অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, "দশজন মাদকসেবীকে গ্রেফতার করার চেয়ে একজন মূল মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা বহুগুণ বেশি কার্যকর ও শ্রেয়।" বিশেষজ্ঞরা আরও ব্যাখ্যা করেন যে, সাধারণ মাদকসেবীদের আটকে রেখে মাদক বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব নয়। মূল হোতারা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে নতুন নতুন মাধ্যম ও সেবনকারী তৈরি করে ব্যবসায় মেতে থাকে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিচ্ছিন্নভাবে সেবনকারীদের পেছনে ছোটার পরিবর্তে মূল সিন্ডিকেট, রুট এবং গডফাদারদের শেকড় উপরে ফেলার মতো কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ। মাদক নির্মূলে বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে—প্রথমত, এলাকার মূল হোতাদের সনাক্ত করে তালিকা তৈরি করা, নৌ ও সড়ক পথের পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি: মাদকের প্রবেশপথ ও রুটগুলো চিহ্নিত করে অভ্যন্তরীণ নদীপথ এবং বাসস্ট্যান্ডভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা। দ্বিতীয়ত, তথ্যদাতাদের সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা: স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ও পক্ষপাতহীন ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা: প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় গুরু ও যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করে প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে শক্তভাবে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা। চতুর্থত, স্কুল-কলেজকেন্দ্রিক সুরক্ষা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে মাদকের আড্ডা ও সরবরাহ কঠোরহস্তে দমন করতে নিয়মিত টহল ও মনিটরিং বাড়ানো। বিশেষজ্ঞদের মতে, গলাচিপা উপজেলায় মাদকের বিস্তার রোধে যদি এখনই সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে এবং পটুয়াখালীর তরুণ সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।